
জন্ম ও বংশ পরিচয়
ছেলেবেলা
জীবিকার সন্ধানে কেরি
প্রায় ১৪ বছরকাল পলার্সপিউরীর জীবন উইলিয়াম কেরির । এর মধ্যে বার বছর বয়স পর্যন্ত তাকে জীবিকার তাগিদে কিছু করতে হয় নি । তবে বার বছর বয়সে তার পিতা এডমন্ড তাকে কৃষিকাজ শেখাবার উদ্যোগ নেন । প্রায় দুই বছরকাল চাষ আর বাগানের কাজে আত্ননিয়োগ করেছিলেন উইলিয়াম কেরি । কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন । কারণ কেরির বিশেষ ধরনের এক চর্মরোগ ছিল যে কারণে তিনি রোদ্রতাপ সহ্য করতে পারতেন না । ফলে এই কাজ তাঁকে ত্যাগ করতে হয়। বলা যেতে পারে, বারো বৎসর থেকেই উইলিয়মের জীবনে জীবিকাসন্ধানের আয়োজন সূচিত হয়েছিল ; চাষের কাজে যখন অসুখের জন্য তিনি অনুপযক্ত বিবেচিত হলেন, তখন এডমণ্ড তাঁকে পলাস পিউরীর নয়-দশমাইল পূর্বে, হ্যাকেল্টনের সম্ভ্রান্ত এক ভদ্রলোক ক্লার্ক' নিকলস, পেশায় জুতা প্রস্তুতকারক, উইলিয়ামকে তার সহযোগী হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অধীনে তিনি জুতা সেলাইয়ের কাজ শিখতেন; কিন্তু বছর দুইয়ের মধ্যেই নিকলসের মৃত্যু হয়। এই সময় উইলিয়মের বয়স ষোল বৎসরের মত। এর কিছুকাল পর তিনি মনিব বদল করেন। কিন্তু নিকলসের সহযোগী হিসাবে কাজ শেখবার সময়, তাঁর দোকানে, যে সামান্য গ্রন্থাদি ছিল, সেগুলি তিনি আগ্রহে পড়েছিলেন। এইসব গ্রন্থাবলীর অনেকগুলিই ধর্মগ্রন্থ, যেমন নিউ টেস্টামেন্ট ছিল একখানি। গ্রন্থভাষ্যে তিনি অপরিচিত গ্রীক শব্দাদির প্রচুর ব্যবহার দেখেছিলেন। কিন্তু গ্রীক তাঁর অজানা, ফলে প্রতি রবিবার যখন তিনি নিজ গ্রাম পলাস পিউরীতে যেতেন, সেখানকার টমাস জোন্সের কাছে তিনি তখন এসে উপস্থিত হতেন, এবং অপরিচিত গ্রীক শব্দগুলির ইংরেজি তর্জমা করে নিতেন। এই টমাস জোন্সের কাছেই ল্যাটিনে পাঠ গ্রহণ করেছিলেন তিনি, এবং গ্রীক শব্দের অর্থান্বেষণে তাঁর কাছেই এইভাবে আবার তাঁর গ্রীক শিক্ষার সূচনা। নিকলসের মৃত্যুর পর, তাঁরই আত্মীয় হ্যাকুল টনের টি. ওলডের অধীনে তিনি শিক্ষানবিশীর কাজ গ্রহণ করেন। এখন পর্যন্ত তিনি জুতা নির্মাণে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন নি, কাজেই পারিশ্রমিক তাঁর খুবই কম ছিল। তদুপরি ওলডের ব্যবহার ছিল অত্যত কর্কশ; তিনি মদ্যপ, বদমেজাজী, রঢ়ভাষী ও ধর্মবাতিকগ্রস্তও ছিলেন।
১৭৮১ সালে হ্যাকেল্টনে নতুন গির্জা স্থাপনের ব্যাপারে কেরী টমাস চ্যাটারের সঙ্গে তাঁর ভাবী শ্বশুর ড্যানিয়েল প্ল্যাকার্ড ও শ্যালকেরও সহযোগী হয়েছিলেন। ঐ বৎসরই ১০ই জুন, তাঁর মাত্র কুড়ি বৎসর বয়সে, মনিব ওডের শ্যালিকা ডরোথি প্ল্যাকার্ডের সঙ্গে কেরীর বিবাহ হয়। ডরোথি নিরক্ষরা ছিলেন। তাই বিবাহের স্বাক্ষরের স্থানে ক্রস চিহ্ন দিয়েছিলেন। বয়সেও কেরী অপেক্ষা তিনি বছর পাঁচেকের বড় ছিলেন। এঁদের মোট ৪টি পুত্র ও ২টি কন্যা সন্তান জন্মেছিল। মেয়ে দুটি অল্পবয়সেই মারা যায়। তাদের পুত্র পিটারও মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মারা যায়। এর কিছুদিনের ভিতরে ওলডের মৃত্যু হলে তিনি স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে থাকেন। নিজের ছোট্ট পরিচ্ছন্ন গৃহে তাঁর জুতো সেলাইয়ের কাজ চলে, সঙ্গে লেখাপড়া আর বাগান রচনার কাজ। এই সময় তিনি হিব্রু, ইতালীয়, ডাচ ও ফরাসি ভাষা শেখেন। জুতা প্রস্তুত করার ফাঁকে ফাঁকে প্রায়শই তিনি পড়াশোনা করতেন। ধর্মবিষয়ে তাঁর অনুসন্ধিৎসার শেষ ছিল না, কপর্দকহীন অবস্থায় ওলনিতে ছুটে গিয়েছেন ডক্টর রাইল্যান্ডের অভিভাষণ শুনবার জন্য। এই সময় টাউসেস্টারের জনৈক মিঃ স্কিনারের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ হন, এবং তিনি তাঁকে Hall-এর "Help to Zion's Travellers" নামক গ্রন্থখানি উপহার দেন। এই গ্রন্থখানি কেরীকে ধর্মানুসন্ধানে বিশেষ সহায়তা করে। ধীরে ধীরে ব্যাপ্টিস্ট মতবাদের দিকে তিনি ঝুকে পড়েন, এবং ১৭৮৩ সালের ৫ই অক্টোবর তারিখে নর্দাম্পটন গির্জার অনতিদূরে জন রাইল্যান্ড তাঁকে ব্যাপ্টিস্ট মতে দীক্ষিত করেন।
কেরীর জীবিকাসন্ধান কখনোই সন্ধানের সীমা অতিক্রম করে তাঁকে স্থির নিশ্চয়তায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। ছেলেবেলা থেকেই তিনি কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন, মেরী কেরী ও ভাই টমাস কেরীর বিবরণে তাঁর চরিত্রের এই দিকটির প্রসঙ্গ অতি নিশ্চিতরূপে নিরূপিত। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে অধ্যাপক পদে বৃত হওয়া পর্যন্ত জীবিকাসন্ধান ও জীবনানুসন্ধানের অতি কঠিন পরীক্ষায় তিনি অগ্রসর হয়েছেন। দারিদ্র্য সত্ত্বেও অদমনীয় প্রাণশক্তি ও পরিশ্রম করবার শক্তি তাঁকে কখনোই স্তব্ধ হতে দেয়নি। হ্যাকলটনের জীবনেও তাঁর জীবিকা ছিল অনিশ্চিত ও পরিশ্রমসাধ্য, দারিদ্র্য অতি ঘনিষ্ঠ সহচর।
ভারতে আগমন
কেরির ভারতে আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মপ্রচার । স্বশিক্ষিত হয়ে উঠার কারণে ইংল্যান্ডের স্থানীয় মিশনারীদের সাথে একটি শখ্যতা গড়ে উঠে কেরির, মাঝে মাঝে তাঁকে স্থানীয় গির্জায় ভাষণ দেওয়ার জন্যও আমন্ত্রণ জানানো হতো। অনেক চড়াই - উৎরাইয়ের পর ১৭৯২ সালের অক্টোবরে কেরি, অ্যান্ড্রু ফিলার, জন রিল্যান্ড, জন সাটক্লিফকে সনদ সদস্য করে গঠিত হয় পারটিকুলার ব্যাপ্টিস্ট সোসাইটি ফর পোপাগেটিং দ্য গসপেল অ্যামোং দ্য হিদেনস (বর্তমানে বিএমএস ওয়ার্ল্ড মিশন)। যা ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটি নামে পরিচিতি । উল্লেখ্য কেরি ভারতে আসার আগে ড. জন টমাস নামে এক মেডিক্যাল মিশনারি কলকাতায় এই ধর্ম প্রচারের কাজ করছিলেন। সেই সময় তিনি অর্থসংগ্রহের কাজে ইংল্যান্ডে আসেন। তারা তাকেই সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ঠিক হয় কেরি তার সঙ্গে ভারতে যাবেন। আর এভাবেই তার ভারতে আসা ।
১৭৯৩ সালের ১৩ জুন কেরী সপরিবারে একটি ইংরেজ জাহাজে করে লন্ডন ছেড়ে উপমহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে কেরীর স্ত্রী ডরোথি আসতে অস্বীকার করেছিলেন । কারণ সেই সময় কেরির চতুর্থ পুত্র ডরোথির গর্ভে। পরে ডরোথির বোন কেটি তাদের সঙ্গে আসবেন জেনে তিনি আসতে রাজি হন। যাত্রাপথে অনেক বিরম্বনার স্বীকার ও হতে হয় । যেমন- আইল অফ ওয়েইট-এ তাদের যাত্রা বিলম্বিত হয়। এর কারণ ছিল একটি বার্তার মাধ্যমে তাদের জাহাজের ক্যাপ্টেন জানতে পারেন এই অননুমোদিত মিশনারিদের কলকাতায় নিয়ে গেলে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া নীতি লঙ্ঘিত হবে। তাই তিনি তাদের জাহাজে স্থান দিতে অস্বীকার করেন। পরে অবশ্য তিনি এক ড্যানিশ ক্যাপ্টেনের সন্ধ্যান পান যিনি কেরির দলটিকে জাহাজে স্থান দিতে রাজি হন । কেরির স্ত্রী ততদিনে তাদের সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। অবশেষে ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে তিনি ও তার সহযাত্রীগণ কলকাতায় উপনীত হন। তখন তার বয়স মাত্র ৩১ বছর। কলকাতায় এসে স্থানীয় লোকদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের জন্য, রামরাম বসুর কাছে বাংলা শিখতে আরম্ভ করেন। এই জন্যই রামরাম বসুকে কেরি সাহেবের মুন্সী বলা হয় ।
শ্রীরামপুর মিশন
মিশন প্রেস
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও কেরি
১৮০০ সালের ০৯ জুলাই কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম চত্বরে এই কলেজ স্থাপিত হলে ও মূলত এর Regulation অনুমোদন হয় ১০ ই জুলাই । অনুমোদন করেন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর-জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি । ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ নাগরিকদের ভারতীয় ভাষায় শিক্ষিত করে তোলা। রেগুলেশন অনুযায়ী ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের শিক্ষণীয় বিষয়কে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে - (১) Oriental Langueges ( ২ ) Oriental Laws and Ethics ( ৩ ) Government Regulations ( ৪ ) European Studies( ৫ ) Science . এর প্রথম চারটি ভাগের শিক্ষাক্রম কলেজে প্রথমাবধিই চালু হয়েছিল। কলেজের পরিকল্পনাটি ছিল বিরাট ও উচ্চাশা পরিপূর্ণ। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ওয়েলেসলির নির্ধারিত পাঠ্যসাচী দীর্ঘ ও ভারবাহী; একে হয়তো অধিকতর বিবেচনা দ্বারা আরও সংহত ও বিশেষ প্রয়োজনের লক্ষ্যে অধিকতর উপযোগী করে তোলা যেত। যে সামান্য সময়কাল একজন সিভিলিয়ন কলেজে শিক্ষাগ্রহণ করবেন, তার মধ্যে তাঁর পক্ষে এতগুলি ও এত বিচিত্র বিষয়ের সঙ্গে সম্যকভাবে পরিচিত হওয়া দুঃসাধ্য। রেভারেন্ড ডেভিড ব্রাউন ও রেভারেড ক্লডিয়াস বুকানন যথাক্রমে কলেজের প্রোভোস্ট ও ভাইস-প্রোভোস্ট নিযুক্ত হন । ভিজিটর হন গভর্ণর জেনারেল স্বয়ং।
ওয়েলেসলির ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কম্পানীর কোর্ট অব ডিরেক্টস' কখনোই সুনজরে দেখেন নি। এই কলেজের অস্তিত্ব লুপ্ত করবার জন্য তাঁরা প্রথমাবধি সঙ্ঘবদ্ধভাবে তৎপর ছিলেন। এর কারণ ইতিহাসে নানাভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে, কিন্তু প্রধান কারণ সম্ভবতঃ এই যে, প্রতিষ্ঠা বিষয়ক প্রস্তাবে কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার ওপর হস্তক্ষেপের মনোভাব প্রকাশিত হয়েছিল। তথাপি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে আপন অস্তিত্ব রক্ষা করেছিল; কোর্টের কৃপাবশতঃই তা সম্ভবপর হয়েছিল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবু ওয়েলেসলির উচ্চাদর্শ ও ব্যাপক পরিকল্পনাকে তাঁরা কার্যতঃ বানচাল করে দিতে পেরেছিলেন হেইলিবেরীতে ইস্ট ইণ্ডিয়া কলেজ ও এ্যাডিসকম্বে মিলিটারী সেমিনারী স্থাপন করে। কিন্তু বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির ইতিহাসে ট্যাঙ্ক স্কোয়ারে ওয়েলেসলির এই কলেজ এরই মধ্যে গরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ভাষার অধ্যাপকরূপে কেরির নিয়োগের প্রস্তাব যখন এলো, তখন মানসিক- ভাবে তিনি খুবই উদ্দীপ্ত বোধ করেছিলেন। এই উদ্দীপনার মধ্যে উত্তেজনার অংশ কম ছিল না। উত্তেজনার প্রধান কারণ দুইঃ প্রথমতঃ, এই প্রস্তাবে তাঁর যোগ্যতা ও কৃতিত্বের যে স্বীকৃতি আছে, কলেজের অধ্যাপনায় সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ কেরীর পক্ষে তার সম্মান রক্ষা করা সম্ভব হবে কিনা, এই সম্পর্কে দ্বিধা; দ্বিতীয়তঃ তিনি নিজেকে প্রধানতঃ মিশনারী রূপে মনে করতেন; এই কাজ গ্রহণ করলে মিশনের কাজ ক্ষতি- গ্রস্ত হবে কিনা অথবা মিশনারী কার্যক্রমে প্রত্যক্ষভাবে তাঁর অংশগ্রহণ করায় কোন বাধা সৃষ্টি হবে কিনা, এই ধরনের কতগুলি সংশয়। অবশ্য সাধারণভাবে মনে হয় যে, ১৮০১ সালের ৮ই এপ্রিল কলেজের প্রোভোস্ট ডেভিড ব্রাউনের কাছ থেকে তিনি যখন নিয়োগের প্রস্তাব পান, তখন তার আকস্মিকতা দ্বারাই তিনি অভিভূত হয়েছিলেন। প্রস্তাব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্শম্যান ও ওয়ার্ডের সঙ্গে এই প্রস্তাব গ্রহণ করার সমীচীনতা সম্পর্কে আলোচনা করে সর্বসম্মতিতে তিনি ব্রাউনের সঙ্গে দেখা করলেন। ব্রাউন ও বুকানন তাঁর দুরকম সংশয়ই নিরসন করেন। তাঁরা বোঝান যে, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে কেরীর যোগ- দান মিশনের উদ্দেশ্যকে অধিকতর সফল হতে সহায়তা করবে, এবং কলেজে কেরীর অধীনে দেশীয় পণ্ডিত নিযুক্ত করা হবে যাতে তাঁর কাজ সহজতর হতে পারে। কেরী আশ্বস্ত হয়ে ব্রাউনের প্রস্তাবে সম্মতি দেন। কিন্তু কলেজের নিয়োগবিধি অনুযায়ী কেরীকে প্রোফেসর রূপে নিয়োগ করার অসুবিধা ছিল। ব্রাউনের কাছ থেকে ওয়েলেসলি কেরীর বাংলা নিউ টেস্টামেন্টের একটি খণ্ড গ্রহণ করেন এবং বাংলা ভাষা শিক্ষাদানে তাঁর যোগ্যতা সম্বন্ধে নিঃসংশয় হন। অবশেষে কলেজের নিয়োগবিধির সাথে সামঞ্জস্য করে কেরীকে 'শিক্ষক' রূপে নিয়োগ করার কথা স্থির হয়। ফলে তাঁর মাসিক বেতন হাজার টাকার পরিবর্তে পাঁচশ টাকা হয়ে যায়। নিয়োগপত্র ১২ই এপ্রিল তারিখে তাঁর হাতে আসে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলার শিক্ষক রূপে কেরী যোগদান করেন ১৮০১ সালের ৪ঠা মে তারিখে। প্রথম দিকে তিনি সপ্তাহে দুদিন ক্লাশ নিতেন, পরে তিনদিন। মঙ্গলবার বিকেলে তিনি কলকাতা যেতেন ও শুক্রবার বিকেলে শ্রীরামপুরে ফিরে আসতেন। যেতেন ও শক্রবার বিকেলে শ্রীরামপুরে ফিরে আসতেন। অর্থাৎ বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার তিনি কলেজে উপস্থিত থাকতেন বলে মনে হয় । ১৮০১ সালের এপ্রিল-মে কেরীর জীবনের এক স্মরণীয় সময় বলে উল্লেখ করা উচিত। কলেজে তাঁর এই পদাধিকার তাঁর ব্যক্তিগত দিক ও মিশনের দিক থেকে ভবিষ্যৎ চরিতার্থতার দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। এরই ফলে বাইবেল অনুবাদের ব্যাপক কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়; ভাষা সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখা সম্ভব হয়, ভারতবর্ষীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে নিজের নামকে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত করে দেবার সুযোগ আসে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সঙ্গে যোগাযোগের ফলে তাঁর যে সর্বব্যাপক কর্মোদ্যমের সূচনা হয়, তারই আলোকে শ্রীরামপরের পাদ্রী কেরী উইলিয়াম কেরীতে উত্তীর্ণ হয়ে যান। ধর্ম-সংকীর্ণতার গণ্ডীকে অতিক্রম করে ধর্ম-নিরপেক্ষ জ্ঞান- বিজ্ঞান-মানবতার পরিপ্রেক্ষিতে আত্মপ্রকাশ করেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজটি ১৮৩০ সালে বন্ধ হয়ে যায়, যেখানে কেরি প্রায় ৩১ বছর বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন।
উইলিয়াম কেরির অবদান
- ১৭৯৮ সালে উইলিয়াম কেরি শ্রীরামপুর ছাত্রাবাস স্থাপন করেন।
- ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের দেশীয় পণ্ডিতদের নিয়ে কেরি শ্রেণি ভিত্তিক কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করেন। রামরাম বসু এবং মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রথম দু বছরে তিনটি গ্রন্থ এবং কেরি একটি বাংলা ব্যাকরণ ও আদর্শ সংলাপের একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন।
- ১৮০৩ সালে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি নিজের মত করে একটি মিশনারি স্থাপন করেন।
- ১৮০৫ সালে তার মারাঠী ব্যাকরণ (Marathi grammar) প্রকাশিত হয়।
- ১৮০৭ সালে তাকে বাউন ইউনিভার্সিটি সম্মান সূচক ডক্টর অফ ডিভিনিটি ডিগ্রি প্রদান করে।
- ১৮০৯ সালে তিনি বাংলাতে সম্পূর্ণ বাইবেলের অনুবাদ এবং ছাপার কাজ সম্পন্ন করেন।
- ১৮১২ সালে কেরির "ইতিহাস মালা" পুস্তকটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে প্রায় ১৫০টি শিরোনামের নানা স্থানের ১৪৮টি গল্প মুদ্রিত হয়।
- ১৮১১ সালে মারাঠি ভাষায় করা তার অনুবাদ নতুন নিয়ম প্রকাশিত হয়।
- ১৮১৪ সালে ভারতবর্ষের জনসাধারণের জন্যে তিনি সরকারের কাছে বিজ্ঞান শিক্ষা বিষয়ক প্রস্তাব (Plan for instructing native inhabitants of India in European Sciences) পেশ করেন।
- ১৮১৫ সালে পাঞ্জাবি ভাষায় করা তার অনুবাদ নতুন নিয়ম প্রকাশিত হয়।
- ১৮১৭ সালে দেশীয় ছাত্রদের মাঝে পুস্তকের অভাব মেটানোর উদ্দেশ্যে কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি স্থাপিত হয়। উইলিয়াম কেরীর নেতৃত্বে ১৬ জন ইউরোপীয়, ৪ জন মৌলভী ও ৪ জন বাঙালী হিন্দু, নিয়ে এর পরিচালক সমিতি গঠন করা হয়।
- ১৮১৮ সালে কেরির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
- ১৮১৯ সালে বড়লাট পত্নী লেডি হেস্টিংসের উৎসাহে ড.উইলিয়াম কেরি একটি কৃষি সমিতি স্থাপন করেন। এই সমিতির কয়েকটি স্থানে আদর্শ কৃষি উদ্যান ছিল।
- ১৮২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হর্টিকালচার ও এ্যাগ্রিকালচার সোসাইটি স্থাপন করেন।
- ১৮২০ সালে তিনি মারাঠি ভাষায় পুরাতন নিয়ম প্রকাশ করেন ।
- ১৮২১ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরামপুর স্কুলকে কলেজে উন্নীত করেন।
- ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি একটি বাংলা-ইংরেজি অভিধান প্রণয়ন করেন।
- ১৮২৯ সালে ৫ ডিসেম্বর সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক যে আইনটি জারি করেন তার বাংলা অনুবাদ করেন বৃদ্ধ কেরি যেটি নিজেই বেন্টিঙ্কের হাতে পৌঁছে দেন।
এক নজরে উইলিয়াম কেরি (১৭৬১-১৮৩৪)
- উইলিয়াম কেরি ১৭ আগস্ট, ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের নর্দানটন শায়ার, টাউসেস্টারের পলার্সপিউরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ।
- তিনি ১৭৯৩ সালে ধর্ম প্রচারের জন্য ভারতে আসেন।
- তিনি বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান হিসেবে ১৮০১ সালের মে মাসে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে যোগদান করেন।
- তিনি ১০ জানুয়ারি, ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ‘শ্রীরামপুর মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন । ‘শ্রীরামপুর মিশন’ থেকে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ ‘মথি রচিত মিশন সমাচার': এটি ১৮ মার্চ, ১৮০০ সালে প্রকাশিত হয় ।
- কেরি রচিত ইংরেজিতে বাংলা ব্যাকরণের নাম ‘এ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ' (১৮০১)।
- তিনি ‘রামায়ণ’ সম্পাদনা (১৮০৬-১৮১০) করেন ।
- ১৮১০ সালে দরিদ্র খ্রিস্টান সন্তানদের জন্য উইলিয়াম কেরি কলকাতায় বোর্ডিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
- তিনি ‘এগ্রি-হার্টিকালচারাল সোসাইটি' (১৮২৩) প্রতিষ্ঠা করেন ।
- বাইবেলের প্রথম বাংলা অনুবাদক উইলিয়াম কেরি । তিনি খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাইবেলের বাংলা অনুবাদ করেন।
- ১৮৩৪ সালের ৯ জুন ৭৩ বছর বয়সে উইলিয়াম কেরি নামক এই ভদ্রলোকের মহান কর্মময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এবং শ্রীরামপুর ব্যাপ্টিস্ট মিশনারীদের সমাধি ক্ষেত্রে তাকে সমাহিত করা হয়।
শ্রীরামপুর মিশন থেকে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থটির নাম কী ?
‘শ্রীরামপুর মিশন’ থেকে মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ ‘মথি রচিত মিশন সমাচার': এটি ১৮ মার্চ, ১৮০০ সালে প্রকাশিত হয় ।
উইলিয়াম কেরি রচিত গ্রন্থগুলো কী কী ?
উইলিয়াম কেরি রচিত গ্রন্থগুলো:
- ‘কথোপকথন’ (১৮০১): এটি বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থ এবং বাংলা ভাষার কথ্যরীতির প্রথম নিদর্শন। একাধিক মানুষের মুখের সাধারণ কথা বা কথোপকথন বা ডায়লগ এ গ্রন্থের উপজীব্য।
- ‘ইতিহাসমালা’ (১৮১২): এটি বাংলা ভাষার প্রথম গল্পগ্রন্থ। বাংলার নানা অঞ্চলে প্রচলিত প্রায় ১৫০টি গল্পের সংকলন এ গ্রন্থটি।
বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর
১. বাংলা ভাষায় মুদ্রিত প্রথম গ্রন্থের নাম নির্দেশ করুন: [ পিটিআই এর শিক্ষক : ১৯]
- রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র
- প্রবোধ চন্দ্রিকা
- লিপিমালা
- কথোপকথন
২. উইলিয়াম কেরি রচিত গ্রন্থের নাম কি ? [ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক : ১৯]
- কথোপকথন
- হিতোপদেশ
- বত্রিশ সিংহাসন
- রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র
৩. কোনটি উইলিয়াম কেরির রচনা ? [ পিটিআই এর ইন্সট্রাক্টর: ১৯]
- বাইবেল
- হিতোপদেশ
- লিপিমালা
- কথোপকথন
৪. বাংলা গদ্যের বিকাশে কোন বিদেশীর অবদান সর্বাধিক ? [আনসার ও ভিডিপি অধিদপ্তরের সার্কেল এডজুট্যান্ট : ১০ ]
- উইলিয়াম কেরী
- লর্ড ওয়েলেসলি
- মার্শম্যান
- ডিরোজিও
৫. যে ইংরেজ ব্যক্তির কাছে বাংলাভাষা চির ঋণী হয়ে আছে তার নাম কী ? [ গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটের সহকারী পরিচালক : ০৩]
- লর্ড ইউলিয়াম বেন্টিংক
- উইলিয়াম কেরী
- লর্ড ক্লাইভ
- ডালহৌসি
৬. উইলিয়াম কেরি রচিত ইতিহাসমালা প্রকাশিত হয় কত খ্রিস্টাব্দে ? [প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক : ১৯ ]
- ১৮০১
- ১৮০২
- ১৮১০
- ১৮১২
৭. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রথম প্রধান কে ছিলেন ? [বাংলাদেশ ব্যাংক সহকারী পরিচালক : ১৫ ]
- মি. উইলিয়াম
- উইলিয়াম কেরি
- রামরাম বসু
- জেসি মার্শম্যান
৮. ‘কথোপকথন’ গ্রন্থটি কার রচনা ? [ ভূমি ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা : ১৩]
- মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
- উইলিয়াম কেরী
- রাজা রামমোহন রায়
- পঞ্চানন কর্মকার
৯. ‘ইতিহাসমালা’র লেখক কে ? [ সহকারী পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা : ১৬]
- উইলিয়াম কেরী
- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
- মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার
- রামরাম বসু
১০. ১৮১০ সালে দরিদ্র খ্রিস্টান সন্তানদের জন্য কলকাতায় কে বোর্ডিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ? [ উপজেলা শিক্ষা অফিসার : ৯৯ ]
- উইলিয়াম কেরী
- মার্শম্যান
- ওয়ার্ড
- লর্ড ম্যাকলে