কাজ, ক্ষমতা ও শক্তি
WORK, POWER AND ENERGY
দৈনন্দিন জীবনে কোনো কিছু করাকে কাজ বলা হলেও পদার্থবিজ্ঞানে কাজ দ্বারা একটি সুনির্দিষ্ট ধারণাকে বুঝায়। কী সে ধারণা? এ অধ্যায়ের শুরুতে আমরা কাজের সে ধারণাকে উপস্থিত করব। বাস্তব জীবনে শক্তি ও ক্ষমতাকে আমরা অনেক সময় এক মনে করলেও শক্তি ও ক্ষমতা কিন্তু মোটেই এক নয়। বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শক্তি। আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখি শক্তি ছাড়া জগৎ অচল। বিভিন্নরূপে আমরা শক্তি পাই। গতিশীল বস্তুর গতির জন্য শক্তি, ভূপৃষ্ঠের খানিক উপরে বস্তুর অবস্থানের জন্য শক্তি, একটি সংকুচিত বা প্রসারিত স্প্রিং এর শক্তি, গরম বস্তুর তাপ শক্তি, আহিত বস্তুর তড়িৎ শক্তি ইত্যাদি। শক্তি ক্রমাগত এক রূপ থেকে অন্যরূপে রূপান্তরিত হচ্ছে, যদিও এ মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ অপরিবর্তনীয় এবং সুনির্দিষ্ট। শক্তির এ রূপান্তরের ঘটনা এবং বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলোর একটি শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি নিয়ে আমরা আলোচনা করব এ অধ্যায়ে। আমাদের দেশে বিদ্যুৎ শক্তির প্রধান যে উৎস কাপ্তাই এর জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র সে সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকবে সবশেষে।
৫.১। কাজ (Work)
দৈনন্দিন জীবনে কোনো কিছু করাকে কাজ বললেও পদার্থবিজ্ঞানে কাজ বলতে বল এবং সরণ সংক্রান্ত একটি বিশেষ অবস্থাকে বুঝায়। কোনো বস্তুর ওপর বল প্রয়োগ করলে যদি বলের প্রয়োগ বিন্দুর কিছু সরণ ঘটে তাহলেই কেবল কাজ হয়।
কোনো বস্তুর ওপর বল প্রয়োগে যদি বস্তুটির সরণ ঘটে, তাহলে বল এবং বলের দিকে বলের প্রয়োগবিন্দুর সরণের উপাংশের গুণফলকে কাজ বলে।
ধরা যাক A বিন্দুতে অবস্থিত কোনো বস্তুর ওপর AB বরাবর F বল প্রয়োগ করা হল। এতে বস্তুটি AB বরাবরই x দূরত্ব অতিক্রম করে B বিন্দুতে পৌছাল [চিত্র ৫.১]। তাহলে F বল দ্বারা সম্পন্ন কাজ হবে-
আবার, ধরা যাক A বিন্দুতে বস্তুর ওপর AB বরাবর F বল প্রয়োগ করা হলে AC বরাবর s দূরত্ব অতিক্রম করে C বিন্দুতে আসে। AB ও AC এর অন্তর্ভুক্ত কোণ $\theta$ [চিত্র ৫.২]। C বিন্দু থেকে AB এর ওপর CD লম্ব টানা হল। তাহলে AB বরাবর বস্তুর সরণের উপাংশ হল $AD = x$। এক্ষেত্রে F বল দ্বারা সম্পন্ন কাজ হবে-
কিন্তু ADC সমকোণী ত্রিভুজে $\cos\theta = \frac{AD}{AC} = \frac{x}{s}$
বা $x = s \cos\theta$
কাজের কোনো দিক নেই, সুতরাং কাজ একটি স্কেলার রাশি।
মাত্রা: কাজের মাত্রা হল, বল × সরণ এর মাত্রা।
একক: যেহেতু $W = Fx$, সুতরাং বলের একককে সরণের একক দিয়ে গুণ করলে কাজের একক পাওয়া যায়। কাজের একক জুল (J)। যদি বল $F = 1\text{ N}$ এবং বলের দিকে সরণ $x = 1\text{ m}$ হয়, তাহলে $W = 1\text{ J}$ হবে।
কোনো বস্তুর ওপর এক নিউটন (1 N) বল প্রয়োগের ফলে যদি বলের দিকে বলের প্রয়োগ বিন্দুর এক মিটার (1 m) সরণ হয় তবে সম্পন্ন কাজের পরিমাণকে এক জুল (1 J) বলে।
25 J কাজ বলতে বুঝায় 1 N বল প্রয়োগে বলের দিকে বলের প্রয়োগ বিন্দুকে 25 m সরাতে যে কাজ হয় তা।
উদাহরণ ৫.১।
500 N বল প্রয়োগে কোনো বস্তুর বলের দিকে সরণ 50 m হলে কৃত কাজের পরিমাণ নির্ণয় কর।
সমাধান:
আমরা জানি,
$W = Fx$
$W = 500\text{ N} \times 50\text{ m} = 2.5 \times 10^4\text{ J}$
এখানে:
বল, $F = 500\text{ N}$
বলের দিকে সরণ, $x = 50\text{ m}$
কাজ, $W = ?$
উত্তorer: $2.5 \times 10^4\text{ J}$
উদাহরণ ৫.২।
70 kg ভরের এক ব্যক্তি 2000 m উঁচু পর্বতে আরোহণ করলে তিনি কত কাজ করবেন? ($g = 9.8\text{ ms}^{-2}$)
সমাধান:
আমরা জানি,
$W = Fx$
বা $W = 686\text{ N} \times 2000\text{ m} = 1.372 \times 10^6\text{ J}$
এখানে:
ব্যক্তির ভর, $m = 70\text{ kg}$
বল, $F =$ ব্যক্তির ওজন $= mg = 70\text{ kg} \times 9.8\text{ ms}^{-2} = 686\text{ N}$
বলের দিকের সরণ, $x = 2000\text{ m}$
কাজ, $W = ?$
উত্তর: $1.372 \times 10^6\text{ J}$
উদাহরণ ৫.৩।
20 N বল কোনো নির্দিষ্ট ভরের বস্তুর ওপর ক্রিয়া করায় বস্তুটি বলের দিকের সাথে $60^\circ$ কোণ উৎপন্ন করে 5 m দূরে সরে গেল। কাজের পরিমাণ নির্ণয় কর।
সমাধান:
আমরা জানি,
$W = Fs \cos\theta$
$\text{বা } W = 20\text{ N} \times 5\text{ m} \times \cos 60^\circ = 20 \times 5 \times \frac{1}{2}\text{ Nm} = 50\text{ J}$
এখানে:
বল, $F = 20\text{ N}$
সরণ, $s = 5\text{ m}$
বল ও সরণের অন্তর্ভুক্ত কোণ, $\theta = 60^\circ$
কাজ, $W = ?$
উত্তর: $50\text{ J}$
৫.২। বিভিন্ন প্রকারের কাজ (Different Types of Work)
কাজ দুই প্রকারের হতে পারে। বলের দ্বারা কাজ বা ধনাত্মক কাজ এবং বলের বিরুদ্ধে কাজ বা ঋণাত্মক কাজ।
ক. বলের দ্বারা কাজ বা ধনাত্মক কাজ:
যদি বল প্রয়োগের ফলে বলের প্রয়োগ বিন্দু বলের দিকে সরে যায় বা বলের দিকে সরণের উপাংশ থাকে তাহলে সেই কাজকে ধনাত্মক কাজ বা বলের দ্বারা কাজ বলে।
একটি ডাস্টার টেবিলের উপর থেকে মাটিতে ফেলে দিলে ডাস্টারটি অভিকর্ষ বলের দিকে নিচে পড়বে। এক্ষেত্রে অভিকর্ষ বলের দ্বারা কাজ বলা হয়েছে বা অভিকর্ষ বলের জন্য ধনাত্মক কাজ হয়েছে বুঝায় [চিত্র ৫.৩ক]।
খ. বলের বিরুদ্ধে কাজ বা ঋণাত্মক কাজ:
যদি বল প্রয়োগের ফলে বলের প্রয়োগ বিন্দু বলের বিপরীত দিকে সরে যায় বা বলের বিপরীত দিকে সরণের উপাংশ থাকে তাহলে সেই কাজকে ঋণাত্মক কাজ বা বলের বিরুদ্ধে কাজ বলে।
একটি ডাস্টার যদি মেঝে থেকে টেবিলের উপর ওঠানো হয় তাহলে অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে কাজ করা হবে বা অভিকর্ষ বলের জন্য ঋণাত্মক কাজ হবে। কেননা, এ ক্ষেত্রে অভিকর্ষ বল যে দিকে ক্রিয়া করে, সরণ তার বিপরীত দিকে হয়। [চিত্র ৫.৩খ]
৫.৩। ক্ষমতা (Power)
কাজ সম্পাদনকারি কোনো ব্যক্তি বা উৎস (যেমন- ডায়নামো, ইঞ্জিন বা অন্য কোনো যন্ত্র) এর কাজ করার হারকে ক্ষমতা বলে। অর্থাৎ, একক সময়ে ব্যক্তি বা উৎসটি দ্বারা সম্পাদিত কাজের পরিমাণই হচ্ছে ক্ষমতা।
কোনো ব্যক্তি বা উৎস $t$ সময়ে $W$ পরিমাণ কাজ সম্পাদন করলে, ক্ষমতা-
ক্ষমতার দিক নেই, কাজেই ক্ষমতা একটি স্কেলার রাশি।
মাত্রা:
একক: যেহেতু $P = \frac{W}{t}$, সুতরাং, কাজের একককে সময়ের একক দিয়ে ভাগ করলে ক্ষমতার একক পাওয়া যায়। ক্ষমতার একক ওয়াট (W)।
যদি সময় $t = 1\text{ s}$, এবং কাজ $W = 1\text{ J}$ হয় তাহলে $P = 1\text{ W}$ হবে।
এক সেকেন্ডে এক জুল কাজ করার ক্ষমতাকে এক ওয়াট বলে।
বিভিন্ন প্রয়োজনে ওয়াটের হাজারগুণ বড় এক কিলোওয়াট ($1\text{ kW}$) এবং দশ লক্ষ গুণ বড় একক মেগাওয়াট ($1\text{ MW}$) ব্যবহার করা হয়।
অনেক সময় ইঞ্জিনের ক্ষমতাকে প্রকাশ করার জন্য অশ্বক্ষমতা ($H.P$) নামের একটি একক ব্যবহার করা হয়।
কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ক্ষমতা 7 MW বলতে বুঝায় উক্ত কেন্দ্রে সরবরাহকৃত বিদ্যুৎ শক্তি দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে $7 \times 10^6\text{ J}$ কাজ করা যায়।
উদাহরণ ৫.৪।
65 kg ভরের এক ব্যক্তি প্রতিটি 25 cm উঁচু 20 টি সিড়ি 10 s এ ওঠতে পারেন। তাঁর ক্ষমতা কত? ($g = 9.8\text{ ms}^{-2}$)
সমাধান:
আমরা জানি,
এখানে:
ব্যক্তির ভর, $m = 65\text{ kg}$
বল, $F =$ ব্যক্তির ওজন $= mg = 65 \times 9.8\text{ N}$
সরণ, $x = 25 \times 20\text{ cm} = 5\text{ m}$
সময়, $t = 10\text{ s}$
ক্ষমতা, $P = ?$
উত্তর: $318.5\text{ W}$
উদাহরণ ৫.৫।
নিচের রিজার্ভার থেকে 30 m উঁচু দালানের ছাদে অবস্থিত ট্যাংকে পানি তোলার জন্য 2 kW এর একটি পাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। পাম্পটি 2 মিনিট চালালে কত পানি তোলা যাবে?
সমাধান:
আমরা জানি,
এখানে:
পাম্পের ক্ষমতা, $P = 2\text{ kW} = 2 \times 10^3\text{ W}$
সরণ, $x = 30\text{ m}$
সময়, $t = 2\text{ min} = 2 \times 60\text{ s}$
পানির ভর, $m = ?$
উত্তর: $816.3\text{ kg}$
৫.৪। শক্তি (Energy)
কোনো বস্তুর কাজ করার সামর্থ্যকে শক্তি বলে। বস্তু সর্বমোট যতখানি কাজ করতে পারে তাই হচ্ছে বস্তুর শক্তির পরিমাপ।
যেহেতু কোনো বস্তুর শক্তির পরিমাপ করা হয় তা দ্বারা সম্পন্ন কাজের পরিমাণ থেকে, সুতরাং, শক্তি ও কাজের পরিমাণ অভিন্ন।
শক্তির কোনো দিক নেই। কাজেই শক্তি স্কেলার রাশি।
মাত্রা: শক্তির মাত্রা ও কাজের মাত্রা একই।
একক: শক্তির একক ও কাজের একক একই অর্থাৎ, জুল (J)।
সাধারণত বিদ্যুৎ শক্তির হিসাব নিকাশের সময় কিলোওয়াট ঘণ্টা (kWh) এককটি ব্যবহৃত হয়। এক কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কোন যন্ত্র এক ঘণ্টা কাজ করলে যে শক্তি ব্যয় হয় তাকে এক কিলোওয়াট ঘণ্টা বলে।
৫.৫। শক্তির রূপ (Forms of Energy)
শক্তি আছে বলেই এ জগৎ গতিশীল। শক্তি না থাকলে জগৎ অচল হয়ে পড়বে। আলোক শক্তি আছে বলেই আমরা দেখতে পাই, শব্দ শক্তি আছে বলেই আমরা শুনতে পাই। যান্ত্রিক শক্তির বদৌলতে আমরা চলাফেরা করি। বিদ্যুৎ শক্তির সাহায্যে পাখা ঘুরছে, কলকারখানা চলছে। এ মহাবিশ্বে শক্তি নানারূপে বিরাজ করছে। মোটামুটিভাবে আমরা শক্তির নয়টি রূপ পর্যবেক্ষণ করি। যথা-
১। যান্ত্রিক শক্তি
২। তাপ শক্তি
৩। শব্দ শক্তি
৪। আলোক শক্তি
৫। চৌম্বক শক্তি
৬। বিদ্যুৎ শক্তি
৭। রাসায়নিক শক্তি
৮। নিউক্লিয় শক্তি
৯। সৌর শক্তি।
এ অধ্যায়ে আমরা শুধু যান্ত্রিক শক্তি সম্পর্কে আলোচনা করব। যান্ত্রিক শক্তিকে আমরা দুই ভাগে ভাগ করতে পারি, যথা- বিভব শক্তি ও গতি শক্তি।
৫.৬। বিভব শক্তি (Potential Energy)
স্বাভাবিক অবস্থান বা অবস্থা থেকে পরিবর্তন করে কোনো বস্তুকে অন্য কোনো অবস্থান বা অবস্থায় আনলে বস্তু কাজ করার যে সামর্থ্য অর্জন করে তাকে বিভব শক্তি বলে।
স্বাভাবিক অবস্থা বা অবস্থান থেকে পরিবর্তন করে কোনো বস্তুকে অন্য অবস্থা বা অবস্থানে আনতে যদি কোনো বলের বিরুদ্ধে কোনো কাজ করা হয় তখন বস্তুটি ঐ পরিমাণ কাজ করার সামর্থ্য লাভ করে। পরবর্তীতে বস্তুটি আবার স্বাভাবিক অবস্থা বা অবস্থানে আসতে ঐ পরিমাণ কাজ করতে পারে। বস্তু এই যে কাজ করার সামর্থ্য লাভ করল তাই বস্তুর মধ্যে শক্তি হিসেবে সঞ্চিত থাকবে। শক্তির এ রূপকেই বলা হয় বিভব শক্তি।
আমরা যখন ভূপৃষ্ঠ থেকে কোনো বস্তুকে উপরে তুলি তখন অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে কাজ করি। ফলে ঐ বস্তু কিছু বিভব শক্তি লাভ করে। বস্তুটি যদি ভূপৃষ্ঠে পড়ে তখন সেটি ঐ পরিমাণ কাজ করতে পারে। কেননা বস্তুটি ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পড়তে অন্য কোনো বস্তুকে উপরে ওঠাতে পারে।
[চিত্র ৫.৪] এ দেখা যাচ্ছে কপি কলের উপর দিয়ে যাওয়া একটি দড়ির দুই প্রান্তে দুটি বস্তু A ও B বাঁধা আছে। ভারী বস্তু A ভূপৃষ্ঠ থেকে উপরে আছে এবং হাল্কা বস্তু B ভূপৃষ্ঠে আছে। এখন A বস্তু নিচে নামতে থাকলে B বস্তুকে উপরে ওঠাবে। ভূপৃষ্ঠ থেকে উপরে থাকার জন্য A বস্তুর মধ্যে কাজ করার এই যে সামর্থ্য আছে—তাই A বস্তুর বিভব শক্তি।
আবার একটি মসৃণ তলের উপর একটি বস্তুকে একটি স্প্রিং এর একপ্রান্তের সাথে সংযুক্ত করে স্প্রিং এর অপর প্রান্ত একটা দৃঢ় অবলম্বনের সাথে আটকানো হল। এখন বস্তুটিকে বল প্রয়োগ করে স্প্রিংটিকে সংকুচিত করে ছেড়ে দিলে স্প্রিংটি তার আগের অবস্থায় আসার সময় কাজ করতে পারবে—পথে অন্য কোনো বস্তু পড়লে তাকে সরাতে পারবে [চিত্র ৫.৫]। স্প্রিংটি তার স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য এই যে কাজ করার সামর্থ্য লাভ করল সেটি তার বিভব শক্তি।
৫.৭। অভিকর্ষজ বিভব শক্তি (Gravitational Potential Energy)
অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে কাজ করে কোনো বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তন করলে বস্তু কাজ করার যে সামর্থ্য লাভ করে তাকে অভিকর্ষজ বিভব শক্তি বলে।
বিভব শক্তির পরিমাপ: $m$ ভরের কোনো বস্তুকে ভূপৃষ্ঠ থেকে $h$ উচ্চতায় ওঠাতে কৃত কাজই হচ্ছে বস্তুতে সঞ্চিত বিভব শক্তির পরিমাপ। আর এক্ষেত্রে কৃতকাজ হচ্ছে বস্তুর ওপর প্রযুক্ত অভিকর্ষ বল তথা বস্তুর ওজন এবং উচ্চতার গুণফলের সমান [চিত্র ৫.৬]।
অর্থাৎ, বিভব শক্তি = বস্তুর ভর × অভিকর্ষজ ত্বরণ × উচ্চতা। একটি ঘরের মেঝের সাপেক্ষে কোনো বস্তুর বিভব শক্তি 60 J বলতে বুঝায় বস্তুর মধ্যে সঞ্চিত শক্তি দ্বারা বস্তুটি ঘরের মেঝেতে নেমে আসতে 60 J কাজ করতে পারে।
কোথা হতে উচ্চতা পরিমাপ করা হচ্ছে তার ওপর বস্তুটির বিভব শক্তি নির্ভর করে। অর্থাৎ, কোথায় আমরা $h=0$ ধরেছি, বিভব শক্তি তার ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, তুমি কোনো ভবনের দোতলায় একটি ঘরে বসে কোনো টেবিল থেকে কিছু ওপরে একটি কলম ধরে আছ। ঐ কলমের বিভব শক্তি কত? কলমের বিভব শক্তি টেবিল, ঐ ঘরের মেঝে এবং ভূপৃষ্ঠের সাপেক্ষে ভিন্ন ভিন্ন হবে। কেননা ঐ তিন অবস্থান থেকে কলমের উচ্চতা ভিন্ন এবং কলমটি টেবিল পর্যন্ত পড়তে যে কাজ করতে পারবে, ঐ ঘরের মেঝেতে পড়তে তার চেয়ে বেশি কাজ করতে পারবে এবং ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত নেমে আসতে কৃত কাজ আরো বেশি হবে। সুতরাং সমস্যা সমাধানে সমীকরণ ব্যবহারের সময় আমাদের সতর্কতার সাথে ঐ সমস্যার জন্য h কত তা বুঝতে হবে।
উদাহরণ ৫.৬।
5kg ভরের একটি বস্তুকে ভূপৃষ্ঠ থেকে 30m উচ্চতায় তুললে এর বিভব শক্তি কত হবে? $g = 9.8\text{ ms}^{-2}$
সমাধান:
আমরা জানি,
$E_p = mgh = 5\text{ kg} \times 9.8\text{ ms}^{-2} \times 30\text{ m} = 1470\text{ J}$
এখানে:
বস্তুর ভর, $m = 5\text{ kg}$
উচ্চতা, $h = 30\text{ m}$
$g = 9.8\text{ ms}^{-2}$
বিভব শক্তি $E_p = ?$
উত্তর: $1470\text{ J}$
৫.৮। গতিশক্তি (Kinetic Energy)
কোনো গতিশীল বস্তু তার গতির জন্য কাজ করার যে সামর্থ্য লাভ করে তাকে গতি শক্তি বলে।
কোনো স্থির বস্তুতে বেগের সঞ্চার করা বা গতিশীল বস্তুর বেগ বৃদ্ধি করার অর্থ হচ্ছে বস্তুটিতে ত্বরণ সৃষ্টি করা। আর এর জন্য বল প্রয়োগ করতে হবে। ফলে বস্তুর ওপর কাজ করা হবে। এতে বস্তুটি কাজ করার সামর্থ্য লাভ করবে এবং এ কাজ বস্তুতে গতি শক্তি হিসেবে জমা থাকবে। সে কারণে সকল সচল বস্তুই গতিশক্তির অধিকারী। বস্তু স্থিতিতে আসার পূর্বে এ পরিমাণ কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
ঢিল ছুঁড়ে আম বা বরই পাড়ার সময় ঢিলের গতি শক্তি আম বা বরইকে বৃত্তচ্যুত করে দূরে ফেলে দেয়।
গতি শক্তির পরিমাপ: কোনো বস্তু যখন স্থির অবস্থায় থাকে তখন কোনো গতিশক্তি থাকে না। ধরা যাক, $m$ ভরের একটি স্থির বস্তুর ওপর $F$ বল প্রয়োগ করায় বস্তুটি $v$ বেগ প্রাপ্ত হল। ধরা যাক, এ সময় বস্তুটি বলের দিকে $s$ দূরত্ব অতিক্রম করে [চিত্র ৫.৭]। বস্তুটিকে এই বেগ দিতে কৃত কাজই বস্তুর গতিশক্তি।
কিন্তু $v^2 = u^2 + 2as$
বা $as = \frac{v^2}{2} \quad [\because \text{আদি বেগ } u = 0]$
যেহেতু বস্তুর ভর $m$ একটি ধ্রুব রাশি, সুতরাং (৫.৫) সমীকরণ থেকে দেখা যায় যে,
অর্থাৎ, নির্দিষ্ট ভরের কোনো বস্তুর গতি শক্তি এর বেগের বর্গের সমানুপাতিক। বস্তুর বেগ দ্বিগুণ হলে গতি শক্তি চারগুণ হবে, বেগ তিনগুণ হলে গতিশক্তি নয়গুণ হবে।
কোনো গাড়ির গতি শক্তি $2 \times 10^6\text{ J}$ বলতে বুঝায় গাড়িটি থেমে যাওয়ার আগে তার গতির জন্য $2 \times 10^6\text{ J}$ কাজ করতে পারে।
উদাহরণ ৫.৭।
1000kg ভরের একটি গাড়ি ঘণ্টায় 36km বেগে চলতে থাকলে এর গতি শক্তি কত হবে?
সমাধান:
আমরা জানি,
$E_k = \frac{1}{2}mv^2$
বা $E_k = \frac{1}{2} \times 1000\text{ kg} \times (10\text{ ms}^{-1})^2 = 5 \times 10^4\text{ kg m}^2\text{s}^{-2} = 5 \times 10^4\text{ J}$
এখানে:
বস্তুর ভর, $m = 1000\text{ kg}$
বস্তুর বেগ, $v = 36\frac{\text{km}}{\text{h}} = \frac{36 \times 10^3\text{ m}}{60 \times 60\text{ s}} = 10\text{ ms}^{-1}$
গতিশক্তি, $E_k = ?$
উত্তর: $5 \times 10^4\text{ J}$
উদাহরণ ৫.৮।
70kg ভরের একজন দৌড়বিদের গতি শক্তি 1260 J হলে তার বেগ কত?
সমাধান:
আমরা জানি,
$E_k = \frac{1}{2}mv^2$
বা $v^2 = \frac{2E_k}{m} = \frac{2 \times 1260\text{ J}}{70\text{ kg}} = 36\frac{\text{kg m}^2\text{s}^{-2}}{\text{kg}}$
$\therefore v = 6\text{ ms}^{-1}$
এখানে:
ভর, $m = 70\text{ kg}$
গতি শক্তি, $E_k = 1260\text{ J}$
বেগ, $v = ?$
উত্তর: $6\text{ ms}^{-1}$
উদাহরণ ৫.৯।
একটি বালক শিশুদের ট্রাই সাইকেলে বসা তার ছোট বোনকে 80 N সমবলে ঠেলছে। ছোট বোনকে 400 J গতি শক্তি প্রদান করতে হলে তাকে কত দূরত্ব ঠেলতে হবে?
সমাধান:
আমরা জানি,
$\text{গতি শক্তি} = \text{কৃত কাজ}$
বা, $E_k = Fx$
$\therefore x = \frac{E_k}{F} = \frac{400\text{ J}}{80\text{ N}} = 5\text{ m}$
এখানে:
বল, $F = 80\text{ N}$
গতি শক্তি, $E_k = 400\text{ J}$
সরণ, $x = ?$
উত্তর: $5\text{ m}$
উদাহরণ ৫.১০।
1kg ভরের বস্তুকে 20m উপর থেকে ছেড়ে দেওয়া হলে ভূপৃষ্ঠকে স্পর্শ করার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এর গতি শক্তি নির্ণয় কর। $g = 9.8\text{ ms}^{-2}$
সমাধান:
আমরা জানি,
$E_k = \frac{1}{2}mv^2$
মাটি স্পর্শ করার পূর্ব মুহূর্তে বেগ $v$ হলে,
$v^2 = u^2 + 2gh$
বা $v^2 = 2gh \quad [\because u = 0]$
$\therefore E_k = \frac{1}{2}m \times 2gh = mgh$
$E_k = 1\text{ kg} \times 9.8\text{ ms}^{-2} \times 20\text{ m} = 196\text{ J}$
এখানে:
ভর, $m = 1\text{ kg}$
উচ্চতা, $h = 20\text{ m}$
আদি বেগ, $u = 0\text{ ms}^{-1}$
$g = 9.8\text{ ms}^{-2}$
গতি শক্তি, $E_k = ?$
উত্তর: $196\text{ J}$
৫.৯। শক্তির রূপান্তর (Transformation of Energy)
আমরা আগে যে বিভিন্ন প্রকার শক্তির কথা বলেছি সেগুলো সকলেই পরস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। অর্থাৎ, কোনো একটা থেকে অন্যটাতে পরিবর্তন সম্ভব। এ পরিবর্তনকে শক্তির রূপান্তর বলে। আসলে প্রায় প্রত্যেক প্রাকৃতিক ঘটনাকেই শক্তির রূপান্তর হিসেবে ধরা যেতে পারে। নিচে শক্তির রূপান্তরের কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হল:
১। যান্ত্রিক শক্তির রূপান্তর: হাতে হাত ঘষলে তাপ উৎপন্ন হয়। এক্ষেত্রে যান্ত্রিক শক্তি তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। কলমের খালি মুখে ফুঁ দিলে যান্ত্রিক শক্তি শব্দ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। পানি যখন ভূপৃষ্ঠ থেকে উপরে থাকে তখন তাতে বিভব শক্তি সঞ্চিত থাকে। নিচে প্রবাহিত হওয়ার সময় এ বিভব শক্তি গতি শক্তিতে পরিণত হয়। আবার এ পানি প্রবাহের সাহায্যে চাকা ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এভাবে যান্ত্রিক শক্তি তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
২। তাপ শক্তির রূপান্তর: স্টীম ইঞ্জিনে তাপের সাহায্যে স্টীম উৎপন্ন করে রেলগাড়ি ইত্যাদি চালানো হয়। এখানে তাপ শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। বালবের ফিলামেন্টের মধ্য দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ফলে তাপ শক্তি আলোকে রূপান্তরিত হয়। দুটি ভিন্ন ধাতব পদার্থের সংযোগস্থলে তাপ প্রয়োগ করলে তাপ শক্তি তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
৩। আলোক শক্তির রূপান্তর: হ্যারিকেনের চিমনিতে হাত দিলে গরম অনুভূত হয়। এখানে আলোক শক্তি তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফটো-ভোলটেইক সেলের ওপর আলোর ক্রিয়ার ফলে আলোক শক্তি তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ফটোগ্রাফিক কাগজের ওপর আলোর ক্রিয়ার ফলে আলোক শক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
৪। শব্দ শক্তির রূপান্তর: শব্দোত্তর বা শব্দেতর তরঙ্গের সাহায্যে সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা হয়। এ ক্ষেত্রে শব্দ শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। পরবশ কম্পন বা অনুনাদের সময় শব্দ শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। আবার টেলিফোন বা রেডিওর প্রেরক যন্ত্রে শব্দ শক্তিকে তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়।
৫। চৌম্বক শক্তির রূপান্তর: একখণ্ড লোহাকে দ্রুত এবং বার বার চুম্বকন ও বিচুম্বকন কালে তাপ উৎপন্ন হয়। এখানে চৌম্বক শক্তি তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তড়িত চুম্বকের সাহায্যে ভারী জিনিসপত্র ওঠানোর কাজ সম্পন্ন করে চৌম্বক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়।
৬। বিদ্যুৎ শক্তির রূপান্তর: তড়িৎ মোটরে তড়িৎ শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি, হিটার ইত্যাদিতে তড়িৎ শক্তি তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। বৈদ্যুতিক বালবে তড়িৎ শক্তি আলোক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। টেলিফোন ও রেডিওর গ্রাহক যন্ত্রে তড়িৎ শক্তি শব্দ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সঞ্চয়ক কোষে তড়িৎ শক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। তড়িৎ চুম্বকে তড়িৎ শক্তি চৌম্বক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
৭। রাসায়নিক শক্তির রূপান্তর: সরল তড়িৎ কোষে রাসায়নিক শক্তি তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। কাঠ, কয়লা, পেট্রোল, কেরোসিন, গ্যাস ইত্যাদি পুড়িয়ে রাসায়নিক শক্তিকে তাপ ও আলোক শক্তিকে রূপান্তরিত করা হয়।
৮। নিউক্লিয় শক্তির রূপান্তর: পারমাণবিক সাবমেরিনে নিউক্লিয় শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। এছাড়াও পারমাণবিক চুল্লীর সাহায্যে নিউক্লিয় শক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
৫.১০। শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি (Principle of Conservation of Energy)
বিবৃতি: শক্তির সৃষ্টি বা বিনাশ নেই, শক্তি কেবল একরূপ থেকে অপর এক বা একাধিকরূপে পরিবর্তিত হতে পারে। মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়।
উপরের উদাহরণগুলো থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এক প্রকার শক্তিকে অন্য যে কোনো প্রকার শক্তিতে রূপান্তর সম্ভব। শক্তি যখন একরূপ থেকে অন্যরূপে পরিবর্তিত হয় তখন শক্তির কোনো ক্ষয় হয় না। এক বস্তু যে পরিমাণ শক্তি হারায় অপর বস্তু ঠিক সে পরিমাণ শক্তি লাভ করে। প্রকৃতপক্ষে আমরা কোনো নতুন শক্তি সৃষ্টি করতে পারি না বা শক্তি ধ্বংস করতেও পারি না। অর্থাৎ, বিশ্বের সামগ্রিক শক্তি ভান্ডারের কোনো তারতম্য ঘটে না। এই বিশ্ব সৃষ্টির প্রথম মুহূর্তে যে পরিমাণ শক্তি ছিল আজও সে পরিমাণ শক্তি বর্তমান। এটাই শক্তির অবিনশ্বরতা বা শক্তির সংরক্ষণশীলতা।
৫.১১। মুক্তভাবে পড়ন্ত বস্তুর ক্ষেত্রে শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি
(Principle of Conservation of Energy for Freely Falling Body)
ধরা যাক, $m$ ভরের কোনো বস্তুকে ভূমি থেকে অভিকর্ষের বিরুদ্ধে খাড়া $h$ উচ্চতায় ওঠিয়ে A বিন্দুতে স্থির অবস্থায় রাখা হল [চিত্র ৫.৮]। A অবস্থানে বস্তুটির সমস্ত শক্তিই বিভব শক্তি। এখন বস্তুটিকে যদি অভিকর্ষের প্রভাবে মুক্তভাবে পড়তে দেওয়া হয় তাহলে বস্তুটিতে গতির সঞ্চার হবে। অভিকর্ষের প্রভাবে বস্তুটি যত ভূমির দিকে পড়বে বস্তুটির বেগ তত বৃদ্ধি পাবে অর্থাৎ, বিভব শক্তি গতি শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।
ধরা যাক,
A বিন্দুতে বস্তুর বিভব শক্তি $= mgh$
A বিন্দুতে বস্তুর গতি শক্তি $= 0$
আবার ধরা যাক, বস্তুটি অভিকর্ষের প্রভাবে A বিন্দু থেকে $x$ দূরত্ব পার হয়ে B বিন্দুতে পৌঁছল। B বিন্দুতে বস্তুর বিভব শক্তি ও গতি শক্তি উভয় থাকবে কারণ বস্তুটি ভূমি থেকে $(h-x)$ উচ্চতায় গতিশীল রয়েছে।
এখন, B বিন্দুতে বস্তুর বিভব শক্তি $= mg(h-x) = mgh - mgx$
এবং B বিন্দুতে বস্তুর গতি শক্তি $= \frac{1}{2}mv^2$
আবার, পড়ন্ত বস্তুর ক্ষেত্রে, $v^2 = u^2 + 2gs$
এখন বস্তুর প্রাথমিক বেগ, $u = 0$ এবং অতিক্রান্ত দূরত্ব, $s = x$
সুতরাং, $v^2 = 2gx$
সুতরাং, B বিন্দুতে বস্তুর মোট শক্তি
অনুরূপভাবে দেখানো যায় যে ভূমি স্পর্শ করার মুহূর্তে C বিন্দুতে মোট শক্তি
সুতরাং অভিকর্ষের প্রভাবে মুক্তভাবে পড়ন্ত বস্তুর ক্ষেত্রে সব সময় বিভব শক্
বস্তু যত নিচে পড়তে থাকে তার বিভব শক্তি তত কমতে থাকে এবং গতি শক্তি বাড়তে থাকে। ভূমি স্পর্শ করার পূর্ব মুহূর্তে সমস্ত বিভব শক্তিই গতি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ, ভূপৃষ্ঠ থেকে $h$ উচ্চতায় অবস্থানকালে বস্তুটির বিভব শক্তি যত হয় অভিকর্ষের প্রভাবে বস্তুটি মুক্তভাবে পড়লে ভূমি স্পর্শ করার মুহূর্তে তার গতি শক্তি তত হয়।
বস্তু যখন ভূমিতে পড়ে এবং স্থির হয় তখন তার সমস্ত গতি শক্তি ও বিভব শক্তি লোপ পায়। কিন্তু তা বলে শক্তি বিনষ্ট হয় না, বরং শব্দ, তাপ, আলোক ইত্যাদি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
৫.১২। শক্তি ও ক্ষমতার পার্থক্য (Distinction between Energy and Power)
| শক্তি | ক্ষমতা |
১. কোনো বস্তুর কাজ করার সামর্থ্যকে শক্তি বলে। | ১. কোনো বস্তু একক সময়ে যে কাজ করতে পারে তাকে ক্ষমতা বলে। |
২. মোট নিষ্পন্ন কাজ দিয়ে শক্তি নির্ধারণ করা হয়। শক্তি নির্ণয়ে তাই সময়ের প্রশ্ন আসে না। | ২. ক্ষমতা নির্ধারণে মোট কাজের কোনো প্রয়োজন নেই। নির্দিষ্ট পরিমাণ কাজ করতে যার সময় যত কম লাগবে তার ক্ষমতা তত বেশি। ক্ষমতা নির্ণয়ে তাই সময়ের প্রশ্ন আসে। |
৩. শক্তির বিভিন্ন রূপ আছে এবং শক্তি একরূপ থেকে অন্যরূপে রূপান্তরিত হয়। | ৩. ক্ষমতার প্রকারভেদ নেই, তাই রূপান্তরের প্রশ্ন উঠে না। |
৪. শক্তির মাত্রা: $[ML^2T^{-2}]$ | ৪. ক্ষমতার মাত্রা: $[ML^2T^{-3}]$ |
৫. শক্তির একক জুল (J)। | ৫. ক্ষমতার একক ওয়াট (W)। |
৫.১৩। জলবিদ্যুৎ (Hydroelectricity)
আমরা জানি পানি শক্তির অন্যতম উৎস। পানির স্রোত ও জোয়ার-পাঁটাকে ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করা যায়। পানির প্রবাহ বা স্রোতকে কাজে লাগিয়ে যে তড়িৎ বা বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয় তাকে বলা হয় জলবিদ্যুৎ। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে পানির বিভব শক্তি ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিভব শক্তি ব্যবহার করা হয়।
পানিকে বাঁধ দিয়ে আটকালে এর উচ্চতা বৃদ্ধি পায়। পানির তলের উচ্চতা বৃদ্ধি বা এর গভীরতা বৃদ্ধির ফলে এর মধ্যে অধিক বিভব শক্তি জমা হয়। কোনো পাহাড়ের উপত্যকায় নিচের প্রান্তে বাঁধ দিয়ে এই কাজটি সাধারণত করা হয়ে থাকে। নদী থেকে আসা পানির প্রবাহ বাঁধে বাধা পেয়ে জমা হতে থাকে, এতে বাঁধের পেছনে কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়। হ্রদ পানিতে পূর্ণ হয়ে গেলে হ্রদ থেকে পানি একটি মোটা নলের ভিতর দিয়ে নিচে অবস্থিত একটি তড়িৎ উৎপাদন কেন্দ্রে প্রবাহিত করা হয়। পানি পতনের সময় এর বিভব শক্তি গতি শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এ গতি শক্তি একটি টার্বাইনকে ঘোরায়। টার্বাইন হল ব্লেডযুক্ত একটি চাকা। টার্বাইনটি একটি তড়িৎ জেনারেটর এর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকে [চিত্র ৫.৯]। এই জেনারেটরে তড়িৎ উৎপন্ন হয়। উৎপন্ন তড়িৎ বিভিন্ন স্থানে তারের মাধ্যমে পাঠানো হয়।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত তড়িতের একটি বড় অংশ জলবিদ্যুৎ। এ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাইতে এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি অবস্থিত। এখানে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে কাপ্তাই হ্রদ নামে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করা হয়েছে। এ হ্রদ থেকে পানি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টার্বাইন ঘোরানোর জন্য প্রবাহিত করা হয়।
৫.১৪। কর্মদক্ষতা (Efficiency)
শক্তির রূপান্তরের সহায়তায় আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটাই। যেমন, পেট্রোলে সঞ্চিত রাসায়নিক শক্তি গতি শক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে আমরা ইঞ্জিন চালাতে পারি। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পেট্রোল পুড়িয়ে আমরা যে গতি শক্তি পেতে পারি তার সবটাই কিন্তু ইঞ্জিনে দেখা যাবে না। এর কারণ শক্তির কিছু অংশ অন্যান্যভাবে ব্যয়িত হয়।
ইঞ্জিনে যতটুকু শক্তি পাওয়া যায় তাকে কার্যকর শক্তি বলে। কোনো যন্ত্রের কর্মদক্ষতা বলতে যন্ত্র থেকে মোট যে কার্যকর শক্তি পাওয়া যায় এবং মোট যে শক্তি দেওয়া হয়েছে তার অনুপাতকে বুঝায়। কর্মদক্ষতাকে সাধারণত $\eta$ (গ্রিক-ইটা) দ্বারা প্রকাশ করা হয়।
কর্মদক্ষতাকে সাধারণ শতকরা হিসাবে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কোনো যন্ত্রের কর্মদক্ষতা 90% বলতে আমরা বুঝি যে, যদি এই যন্ত্রে 100 J শক্তি দেওয়া হয়, তাহলে সে যন্ত্র থেকে লভ্য কার্যকর শক্তি 90 J হবে।
উদাহরণ ৫.১১।
20kW ক্ষমতার একটি ইঞ্জিন। অর্ধ মিনিটে 3000 kg পানি 10m উপরে তুলতে পারে।
(ক) লভ্য কার্যকর শক্তি
(খ) লভ্য কার্যকর ক্ষমতা এবং
(গ) ইঞ্জিনের কর্মদক্ষতা নির্ণয় কর।
সমাধান:
আমরা জানি,
(ক) লভ্য কার্যকর শক্তি, $E = \text{ইঞ্জিন দ্বারা কৃতকাজ} = \text{পানির বিভব শক্তি} = mgh$
(খ) লভ্য কার্যকর ক্ষমতা, $P = \frac{\text{লভ্য কার্যকর শক্তি}}{\text{সময়}} = \frac{294000\text{ J}}{30\text{ s}} = 9800\text{ W} = 9.8\text{ kW}$
(গ) কর্মদক্ষতা, $\eta = \frac{\text{লভ্য কার্যকর ক্ষমতা}}{\text{মোট প্রদত্ত ক্ষমতা}} = \frac{9.8\text{ kW}}{20\text{ kW}} \times 100\% = 49\%$
এখানে:
ইঞ্জিনের ক্ষমতা, $P = 20\text{ kW}$
পানির ভর, $m = 3000\text{ kg}$
উচ্চতা, $h = 10\text{ m}$
সময়, $t = 30\text{ s}$
উত্তর: (ক) $2.94 \times 10^5\text{ J}$ (খ) $9.8\text{ kW}$ (গ) $49\%$