
প্রকারভেদ
ব্যাকটেরিয়া কোষ গোলাকার, দণ্ডাকার, কমা আকার, প্যাঁচানো ইত্যাদি নানা ধরণের হতে পারে। দেহের আকার আকৃতির ভিত্তিতে ব্যাকটেরিয়া সাত প্রকার ৷ যথা:
- ক) কক্কাস : কোনো কোনো ব্যাকটেরিয়া কোষের আকৃতি গোলাকার। এরা কক্কাস ব্যাকটেরিয়া। এরা এককভাবে অথবা দলবেঁধে থাকতে পারে, যেমন- নিউমোনিয়া রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া।
- খ) ব্যাসিলাস : এরা দেখতে লম্বা দণ্ডের ন্যায়। ধনুষ্টংকার, রক্তামাশয় ইত্যাদি রোগ এরা সৃষ্টি করে।
- গ) কমা : এরা বাঁকা দণ্ডের ন্যায় আকৃতির ব্যাকটেরিয়া। মানুষের কলেরা রোগের ব্যাকটেরিয়া এ ধরনের।
- ঘ) স্পাইরিলাম: এ ধরণের ব্যাকটোরিয়ার আকৃতি প্যাচানো।
- ঙ) স্টিলেট বা তারকাকার : এরা দেখতে অনেকটা তারার ন্যায় ।
- চ) বর্গাকৃতির : এদের গঠন চার বাহুবিশিষ্ট ।
- ছ) বহুরূপী : এরা সুনির্দিষ্ট আকার বিহীন ।
রঞ্জনের ভিত্তিতে ব্যাকটেরিয়া দুই প্রকার ৷ যথা:
- ক) গ্রাম পজিটিভ : যে সমস্ত ব্যাকটেরিয়া ক্রিস্টাল ভায়োলেট রং ধরে রাখে সে সমস্ত ব্যাকটেরিয়াকে গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া বলে ।
- খ) গ্রাম নেগেটিভ : যে সমস্ত ব্যাকটেরিয়া ক্রিস্টাল ভায়োলেট রং ধরে ধরে রাখতে পারে না সে সমস্ত ব্যাকটেরিয়াকে গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া বলে ।
ব্যাকটেরিয়ার বৈশিষ্ট্য
- এরা এককোষীয় এবং আণুবীক্ষণিক ।
- এরা আদিকোষ/ প্রাককেন্দ্রিক (Prokaryotic).
- এরা পরজীবী, মৃতজীবী বা স্বনির্ভর হতে পারে।
- সাধারণত দ্বিবিভাজন প্রক্রিয়ায় এরা বংশ বৃদ্ধি করে।
- ফায ভাইরাসের প্রতি এরা খুবই সংবেদনশীল ।
- এদের অধিকাংশই খনিজ লবণ জারিত করে শক্তি সংগ্রহ করে ।
- কতক ব্যাকটেরিয়া অবায়বীয় অর্থাৎ অক্সিজেন থাকলে বাঁচতে পারে না। কতক সুবিধাবাদী অবায়বীয় অর্থাৎ অক্সিজেনের উপস্থিতিতেও বাঁচতে পারে । কতক বাধ্যতামূলক বায়বীয় অর্থাৎ অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না ।
- ব্যাকটেরিয়া প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এন্ডোস্পোর বা অন্তরেণু গঠন করে । এ অবস্থায় এরা ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে ।
- মানুষের দেহে যতগুলো কোষ আছে, এর থেকে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ১০-১০০ গুণ বেশি
- যেসব অণুজীব রোগ সৃষ্টি করে তাদের বলা হয় প্যাথজোনিক।
- প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়া: যে সকল ব্যাকরেটিয়া রোগ সৃষ্টি করে, তাদেরকে প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়া বলা হয়।
- অ্যারোবিক ব্যাকটেরিয়া: যে সকল ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেনের উপস্থিতি ছাড়া বাচতে পারে না, তাদের অ্যারোবিক ব্যাকটেরিয়া বলে।
- অ্যানারোবিক ব্যাকটেরিয়া: যে সকল ব্যক্টেরিয়া বায়ুর উপস্থিতি ছাড়া বেঁচে থাকতে পারে, তাদের অ্যানারোবিক ব্যাকটেরিয়া বলে।
- ফেকালটেটিভ ব্যাকটেরিয়া: যে সকল ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেনের উপস্থিতিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে কিন্তু অক্সিজেনের উপস্থিতি ছাড়াও বাঁচতে পারে, তাদের ফ্যাকালটেটিভ ব্যাকটেরিয়া বলে।
- প্রাণিদেহে জীবাণুজাত বিষ নিষ্ক্রিয়কারী রাসায়নিক পদার্থের নাম অ্যান্টিবডি।
- নিষ্পিষ্ট মসলায় লবণ মিশিয়ে অনেকদিন রাখা যায় কেন: লবণ পচনকারী জীবাণুর বংশ বিস্তার রোধ করে।
ব্যাকটেরিয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্ব
- চামড়া শিল্পে: চামড়া থেকে লোম ছাড়ানোর কাজে Bacillus-এর বিভিন্ন প্রজাতি ব্যবহৃত হয়।
- দুগ্ধ শিল্পে: যেমন দুধ থেকে দই তৈরি করে থাকে Lactobacillus এবং Streptococcus নামক ব্যাকটেরিয়া।
- অ্যালকোহল ও অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ।
- অ্যান্টিবায়োটিক তৈরিতে: যেমন- Bacillus subtlis থেকে সাবটিলিন নামক অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয়।
- ভ্যাক্সিন তৈরি: B.C.G., D.PT. টিটেনাস টক্সয়েড (TT) ইত্যাদি ভ্যাকসিন তৈরিতে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহৃত হয়।
- ইনসুলিন তৈরিতে: জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে ইনসুলিন অল্প সময়ে ও অল্প ব্যয়ে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
- বায়োগ্যাস উৎপাদনে: ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতায় আবর্জনা ও গোবর থেকে বায়োগ্যাস উৎপন্ন হয়।
- মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট (M.S.G.) বা টেস্টিং সল্ট তৈরিতে ব্যাকটেরিয়া ব্যবহৃত হয়।
- পাট গাছ থেকে আঁশ ছাড়ানো: পাট গাছ থেকে পাটের আঁশ সংগ্রহ করা হয়। পাট গাছ থেকে এ আঁশ সংগ্রহে ব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাটের আঁশ সংগ্রহ করতে সাহায্য করে Clostridium pectinovorum নামক ব্যাকটেরিয়া ।
- ব্যাকটেরিয়া জীন প্রকৌশলের মূল ভিত্তি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জীবের কাঙ্খিত বৈশিষ্ট্য পাওয়ার জন্য জীনগত পরিবর্তনের কাজে ব্যাকটেরিয়াকে ব্যবহার করা হয় ।
- একমাত্র ব্যাকটেরিয়াই প্রকৃতি থেকে মাটিতে নাইট্রোজেন সংবন্ধন করে।
- মৃত জীবদেহ ও আর্বজনা পঁচাতে ব্যাকটেরিয়া সাহায্য করে।
ব্যবহার
- অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরীতে : ব্যাকটেরিয়া হতে সাবটিলিন, পলিমিক্সিন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করা হয় ।
- ব্যাকটেরিয়া হতে যেসব প্রতিষেধক/ টীকা /ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়:
| রোগ | ভ্যাকসিনের নাম |
|---|---|
| যক্ষ্মা | B.C.G |
| ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, হেপাটাইটিস-বি, Haemophylus influenzae ঘটিত মেনিনজাইটিস | Pentavaccine |
| ধনুষ্টংকার | T.T |
| টাইফয়েড | টাইফয়েড ভ্যাকসিন |
| Polio | Polio |
- Oral Polio Vaccine কোন ধরনের: Live attenuated, Subunit ও Toxoid.
- যক্ষ্মার টিকা: যক্ষ্মা রোগের প্রতিষেধক হিসেবে দেয়া হয় বিসিজি (Bacillus Calmatte Guerin) টিকা। অন্যদিকে ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি ও টিটেনাসের প্রতিষেধক হিসেবে ডিপিটি (DPT) টিকা দেয়া হয়। আর টিটি (Tetanus Toxoid) প্রতিষেধক টিকা দেয়া হয় টিটেনাস রোগ থেকে রক্ষার জন্য।
- ইপিআই কর্মসূচীর মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগের সংখ্যা বর্তমানে ১০টি যথা: যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস বি, পোলিও মাইলাইটিস, হাম, নিউমোনিয়া, রুবেলা এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি (২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী)। নিউমোনিয়া ও রুবেলা ২০১০ থেকে শুরু হয়েছে।
- আমাদের অগ্রে যে ব্যাকটেরিয়া থাকে: Escherichia coli.
- চা, তামাক, কফি প্রক্রিয়াকরণে কোন অণুজীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে: ব্যাকটেরিয়া।
- পাট হতে আশ ছড়াতে, চামড়া হতে লোম ছড়াতে, দুধ হতে মাখন, দই, পনির তৈরিতে কোন অণুজীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে: ব্যাকটেরিয়া।
- সমুদ্রের পানিতে ভাসমান তেল কিভাবে অপসারণ করা হয়: তেল খাদক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে।
- কোন ব্যাকটেরিয়া ভিনেগার প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়: Acetobacter xylinum
- কোন ব্যাকটেরিয়া ল্যাকটিক এসিড প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়: Bacillus lacticacidi
- কোন ব্যাকটেরিয়া অ্যাসিটোন প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়: Clostridium acetobutylicum
- নাইট্রোজেন নিয়ে নাইট্রোজেন যৌগ গঠন করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে: Azotobacter, Pseudomonas, Clostridium.
- শীম জাতীয় উদ্ভিদে কোন ধরণের ব্যাকটেরিয়া নাইট্রোজেনকে নাইট্রেটে পরিণত করে: Rhizobium
ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টরোগ
- ব্যাকটেরিয়া প্রাণিদেহে কি কি রোগ সৃষ্টি করে: গরু মহিষের যক্ষ্মা, ভেড়ার অ্যানথ্রাক্স, ইদুরের প্লেগ এবং মুরগীর কলেরা রোগ ইত্যাদি।
- ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদের কি কি রোগ সৃষ্টি করে: গমের টুন্ডুরোগ, ধানের ব্রাইট, আখের আঠাঝড়া রোগ, টম্যাটোর ক্যাংকার, আলুর পচা রোগ, ভূট্টার বোটা পচা রোগ ইত্যাদি।
- ব্যাকটেরিয়া মানুষের কি কি রোগ সৃষ্টি করে:
| রোগ | ব্যাকটেরিয়া | রোগ বিস্তারের মাধ্যম |
|---|---|---|
| যক্ষ্মা | Mycobacterium tuberculosis | বায়ু |
| নিউমোনিয়া | Streptococcus pneumoniae | বায়ু |
| ডিপথেরিয়া | Corynebacterium diptheriae | বায়ু |
| হুপিংকাশি | Bordetella pertussis | বায়ু |
| মেনিনজাইটিস | Neisseria meningitidis | বায়ু |
| গনোরিয়া | Neisseria gonorrhoeae | যৌন |
| সিফিলিস | Treponema pallidum | যৌন |
| টাইফয়েড | Salmonella typhi | খাদ্য, পানি |
| প্যারাটাইফয়েড | Salmonella paratyphi | খাদ্য, পানি |
| কলেরা | Vibrio cholerae | খাদ্য, পানি |
| রক্ত আমাশয় | Shigella dysenteriae | খাদ্য, পানি |
| কুষ্ঠ / লেপ্রোসি | Mycobacterium leprae | দীর্ঘদিন রোগীর সংস্পর্শে |
| ধনুস্টংকার | Clostirdium tetani | ক্ষতস্থান দিয়ে |
| প্লেগ | Yersenia pestis | ইঁদুর |
| Leishmaniasis (কালাজ্বর) | ||
| Pertusis(হুপিংকফ) | ||
| Tuberculosis |
- নিউমোনিয়া: ফুসফুসের প্রদাহকে নিউমোনিয়া বলে।
- নিউমোনিয়ার কারণ:
ক) ব্যাকটেরিয়া: স্টেপটোকক্কাস, স্টেফাইলোকক্কাস ইত্যাদি।
খ) ভাইরাস: ইনফ্লুয়েঞ্জা, প্যারাইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি।
গ) কৃমি: গোলকৃমি। - ডিপথেরিয়া রোগে দেহের কোন অংশ আক্রান্ত হয়: গলা।
- কুষ্ঠরোগের লক্ষণ: ত্বকে বিশেষ ধরনের ক্ষতে ব্যথাহীনতা।
- নানা প্রকার টাটকা ও সংরক্ষিত খাদ্য দ্রব্যের পচন ঘটায়: ব্যাকটেরিয়া।
- দুধ দহনের পর বেশিক্ষণ রেখে দিলে তা টক হয়ে যায় কেন: দুধের ল্যাক্টোজ থাকে। দুধের ব্যাক্টোরিয়া ল্যাক্টোজকে ল্যাকটিক এসিডে পরিণত করে। ফলে দুধ টক হয়।
- লাইভ ভ্যাকসিন:
১. হাম/মিসেল্স
২. মাম্পস
৩. রুবেলা
৪. যক্ষা (টিউবারকুলোসিস/ টিবি)
৫. টাইফয়েড
৬. ভ্যারিসেলা (বসন্ত)
৭. পোলিও
৮. ইয়োলো ফিভার / পীত জ্বর
৯. ইনফ্লুয়েঞ্জা
রক্ত আমাশয়ের জীবাণুর নাম: রক্ত আমাশয়ের প্রধান কারণ হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া যার নাম শিগেলা যা দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। রক্ত আমাশয়ের লক্ষণ হলো-পেটে তীব্র মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া, অল্প অল্প করে বার বার পায়খানা, পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া এবং মলদ্বারে তীব্র ব্যাথা হওয়া।
পাস্তুরায়ন: দুধকে জীবানুমুক্ত করার প্রক্রিয়াকে পাস্তুরায়ন বলে। এ প্রক্রিয়ায় দুধকে ৩ মিনিট ধরে ১৪০০-১৫০° ফারেনহাইট তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করে হঠাৎ ৫০° ফারেনহাইট তাপমাত্রায় নামিয়ে আনলে দুধ জীবাণুমুক্ত হয়। তাপমাত্রা ৫০° সেলসিয়াস এর নিচে রাখলে অন্তত দুদিন দুধ ভাল থাকে। ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর এ প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেন। আবিষ্কারকের নামানুসারে এ পদ্ধতির নামকরণ করা হয়েছে 'পাস্তুরায়ন'।