পদার্থ কাকে বলে ?
যে বস্তুর নির্দিষ্ট ভর আছে, জড়তা আছে, জায়গা দখল এবং যা তার গতিশীল বা স্থিতিশীল অবস্থার পরিবর্তন বাধা প্রদান করে তাকে পদার্থ বলে । যেমন –টেবিল, চেয়ার, মাটি, পানি, বাতাস ইত্যাদি । অন্যভাব বলা যায়, যার ভর ও ভরজনিত জড়তা আছে তাই পদার্থ ।
পদার্থ কত প্রকার ও কি কি ? সংজ্ঞাসহ এদের ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য আলােচনা কর ।
অবস্থাভেদে পদার্থ তিন প্রকার : যেমন- ১.কঠিন পদার্থ ২. তরল পদার্থ ৩. গ্যাসীয় বা বায়বীয় পদার্থ
কঠিন পদার্থ (Solids):
যে সকল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর, নির্দিষ্ট আকার, নির্দিষ্ট আয়তন এবং কমবেশি দৃঢ়তা আছে তাদেরকে কঠিন পদার্থ বলে ।যেমন – লোহা, মাটি, পাথর ইত্যাদি ।
তরল পদার্থ (Liquids):
যে সকল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর ও নির্দিষ্ট আয়তন আছে কিন্তু নির্দিষ্ট কোনাে আকার নেই। যখন যে পাত্রে রাখা হয়, সেই পাত্রের আকার ধারণ করে তাদেরকে তরল পদার্থ বলে। যেমন-পানি,পেট্রোল, কেরোসিন ইত্যাদি।
গ্যাসীয় বা বায়বীয় পদার্থ (Gases):
যে সকল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর আছে কিন্তু নির্দিষ্ট আকার কিংবা নির্দিষ্ট আয়তন নেই।ছোট বড় যে পাত্রেই রাখা হয়, সেই পাত্রেরই আকার ও আয়তন ধারণ করে তাদেরকে গ্যাসীয় পদার্থ বলে। যেমন – কার্বন ডাই অক্সাইড, হাইড্রোজেন গ্যাস, অক্সিজেন গ্যাস ইত্যাদি।
ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য :
কঠিন পদার্থ (Solids):
কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট ভর, নির্দিষ্ট আকার, নির্দিষ্ট আয়তন এবং কমবেশি দৃঢ়তা থাকে। সব পদার্থের কণাগুলাের মধ্যেই এক ধরনের আকর্ষণ বল থাকে। একে আন্তঃকণা আকর্ষণ বল বলা হয়। কঠিন পদার্থের কণাগুলাের মধ্যে আন্তঃকণা আকর্ষণ বল সবচেয়ে বেশি। এ কারণে কঠিন পদার্থের কণাগুলাে খুব কাছাকাছি এবং নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকে, ফলে কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আকার হয়, কঠিন পদার্থের উপর চাপ প্রয়ােগ করলে এরা সংকুচিত হয় না। আবার, তাপমাত্রা বাড়ালে কঠিন পদার্থের আয়তন খুবই কম পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
তরল পদার্থ (Liquids):
তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর ও নির্দিষ্ট আয়তন আছে কিন্তু নির্দিষ্ট কোনাে আকার নেই। তরল পদার্থকে যে পাত্রে রাখা হয় তরল পদার্থ সেই পাত্রের আকার ধারণ করে। তরলের কণাগুলাে কঠিন পদার্থের কণাগুলাের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি দূরত্বে থাকায় এদের মধ্যে আন্তঃকণা আকর্ষণ বল কঠিনের চেয়ে কম হয়। তরল পদার্থকে চাপ প্রয়ােগ করলে এদের আয়তন হ্রাস পায় না। তবে এতে তাপ প্রয়ােগ করলে তরল পদার্থের আয়তন বৃদ্ধি পায়। এই আয়তন বৃদ্ধির পরিমাণ কঠিন পদার্থের চেয়ে বেশি। অণুসমূহ স্থান পরিবর্তন করতে পারে বলে তরল পদার্থের কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই ।
গ্যাসীয় বা বায়বীয় পদার্থ (Gases):
গ্যাসীয় পদার্থের নির্দিষ্ট ভর আছে কিন্তু নির্দিষ্ট আকার কিংবা নির্দিষ্ট আয়তন নেই। যেকোনাে পরিমাণ গ্যাসীয় পদার্থ যেকোনাে আয়তনের পাত্রে রাখলে গ্যাসীয় পদার্থ সেই পাত্রের পুরাে আয়তন দখল করে। কিন্তু পাত্রের আকার বা আকৃতিভেদে ভরের কোনো তারতম্য হয় না। গ্যাসীয় পদার্থের কণাগুলাে কঠিন ও তরলের চেয়ে অনেক বেশি দূরে দূরে অবস্থান করে বলে এদের আন্তঃকণা আকর্ষণ বল খুবই কম, ফলে তারা প্রায় সম্পূর্ণ মুক্তভাবে চলাচল করা । গ্যাসীয় পদার্থের উপর সামান্য চাপ প্রয়ােগ করলে গ্যাসীয় পদার্থের আয়তন অনেক কমে যায়। আবার, তাপ প্রয়ােগ করলে গ্যাসীয় পদার্থের আয়তন অনেক বেড়ে যায়।
কঠিন পদার্থ, তরল পদার্থ ও গ্যাসীয় বা বায়বীয় পদার্থের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করো ।
| কঠিন | তরল | গ্যাসীয় বা বায়বীয় |
| ১.কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট ভর, নির্দিষ্ট আকার, নির্দিষ্ট আয়তন আছে । | ১.তরল পদার্থের নির্দিষ্ট ভর ও নির্দিষ্ট আয়তন আছে কিন্তু নির্দিষ্ট কোনাে আকার নেই। | ১.গ্যাসীয় পদার্থের নির্দিষ্ট ভর আছে কিন্তু নির্দিষ্ট আকার কিংবা নির্দিষ্ট আয়তন নেই। |
| ২.কঠিন পদার্থের কণাগুলাের মধ্যে আন্তঃকণা আকর্ষণ বল সবচেয়ে বেশি। | ২.তরলের কণাগুলাের মধ্যে আন্তঃকণা আকর্ষণ বল কঠিনের চেয়ে কম হয়। | 2.গ্যাসীয় পদার্থের কণাগুলাে মধ্যেআন্তঃকণা আকর্ষণ বল খুবই কম, ফলে তারা প্রায় সম্পূর্ণ মুক্তভাবে চলাচল করা । |
| ৩.কঠিন পদার্থের কণাগুলাে খুব কাছাকাছি এবং নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকে। | ৩.তরলের কণাগুলাে কঠিন পদার্থের কণাগুলাের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি দূরত্বে থাকে। | ৩. গ্যাসীয় পদার্থের কণাগুলাে কঠিন ও তরলের চেয়ে অনেক বেশি দূরে দূরে অবস্থান করে । |
| ৪.তাপমাত্রা বাড়ালে কঠিন পদার্থের আয়তন খুবই কম পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। | ৪.তাপ প্রয়ােগ করলে তরল পদার্থের আয়তন বৃদ্ধি পায়। এই আয়তন বৃদ্ধির পরিমাণ কঠিন পদার্থের চেয়ে বেশি। | ৪.তাপ প্রয়ােগ করলে গ্যাসীয় পদার্থের আয়তন অনেক বেড়ে যায়। |
| ৫.কঠিন পদার্থের অণুসমূহের আন্তঃআণবিক দূরত্ব সবচেয়ে কম । | ৫.তরল পদার্থের অণুসমূহের আন্তঃআণবিক দূরত্ব কঠিন পদার্থের তুলনায় বেশি । | |
| ৬.কঠিন পদার্থের উপর চাপ প্রয়ােগ করলে এরা সংকুচিত হয় না। | ৬.তরল পদার্থকে চাপ প্রয়ােগ করলে এদের আয়তন হ্রাস পায় না।তবে গ্যাসীয় পদার্থের তুলনায় তরলের উপর চাপের প্রভাব অত্যন্ত কম কিন্তু কঠিনের তুলনায় বেশি। | ৬.গ্যাসীয় পদার্থের উপর সামান্য চাপ প্রয়ােগ করলে গ্যাসীয় পদার্থের আয়তন অনেক কমে যায়। |
আন্তঃকণা আকর্ষণ বল কাকে বলে ? আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বল বা শক্তি কাকে বলে ? আন্তঃকণা আকর্ষণ শক্তি কাকে বলে ?
সকল পদার্থই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত। এই কণাগুলাে একে অপরকে আকর্ষণ করে যাকে আন্তঃকণা আকর্ষণ শক্তি বলা হয়।একই পদার্থের ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রায় ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা প্রদর্শন করার কারণ ব্যাখ্যা করো । অথবা তাপমাত্রা পরিবর্তন করে একই পদার্থ কখনাে কঠিন, কখনাে তরল বা কখনাে গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তর করা যায়।
একই পদার্থ ভিন্ন ভিন্ন তাপমাত্রায় বিভিন্ন অবস্থা অর্থাৎ কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় অবস্থায় থাকতে পারে। এর কারণ মূলত তাপমাত্রা পরিবর্তনের সাথে পদার্থের আন্তঃআণবিক শক্তি ও আন্তঃআণবিক স্থানের পরিবর্তন। আন্তঃআণবিক শক্তির কারণে পদার্থের অভ্যন্তরস্থ অণুসমুহ পরস্পরের সন্নিকটে থাকতে চায়। পদার্থের অণুসমূহ সর্বদই কম্পমান অবস্থায় থাকে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে অণুসমূহের গতিশক্তি বৃদ্ধি পায়। ফলে কম্পন বৃদ্ধি পায় এবং আন্তঃআণবিক শক্তি হ্রাস পায় । অন্যদিকে তাপমাত্রা কমালে অণুসমূহের কম্পন্ন হ্রাস পায় এবং আন্তঃআণবিক শক্তি বৃদ্ধি পায়। এ দুটি বিপরীত ক্রিয়ার ফলে কোনো পদার্থ তিনটি ভিন্ন অবস্থায় উপনীত হয় ।
১. কঠিন অবস্থা:
আন্তঃআণবিক শক্তির তুলনায় অণুসমূহের কম্পন শক্তি অনেক কম হলে অণুসমূহ নির্দিষ্ট অবস্থান বিরাজ করে। ফলে অণুসমূহেৱ মধ্যবর্তী দূরত্ব হ্রাস পায় এবং অণুসমূহ পরস্পর ঘন সন্নিবিষ্ট হয়। ফলে পদার্থ নির্দিষ্ট আকৃতি অর্জন করে এবং কঠিন আকার ধারণ করে।
২. তরল অবস্থাঃ
তাপমাত্রা বৃদ্ধি করলে পদার্থের অণুসমূহ গতিশক্তি অর্জন করে । ফলে পদার্থের অণুর কম্পনশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং এত বেশি বৃদ্ধি পায় যে, অণুসমূহ আর নির্দিষ্ট অবস্থানে স্থির না থেকে বিক্ষিপ্তভাবে চলাচল করে। ফলে অণুসমূহের আন্তঃআণবিক শক্তি হ্রাস পায় এবং এক পর্যায়ে কঠিন পদার্থ তার দৃঢ়তা হারিয়ে তরল পদার্থে পরিণত হয় ।
৩. গ্যাসীয় অবস্থাঃ
তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি করলে অণুসমূহের গতিশক্তি এত বৃদ্ধি পায় যে, তারা আন্তঃআণবিক শক্তি ছিন্ন করে পরস্পর হতে অনেক দূরে সরে যায় এবং প্রায় মুক্ত ভাবে চলাচল করে। এ অবস্থায় তরল পদার্থ গ্যাসীয় অবস্থায় পরিণত হয় ।
পদার্থে রূপান্তর বা অবস্থার পরিবর্তন (Transformation of matter) ব্যাখ্যা করো ।
সাধারণত একই পদার্থ কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় এই তিনটি অবস্থাতেই বিরাজ করতে পারে । কোন পদার্থের এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তনকে পদার্থের রূপান্তর বলে । সাধারণত কঠিন পদার্থে তাপ দিলে তা তরল পদার্থে পরিণত হয় এবং তরল পদার্থে আরো তাপ দিলে তা গ্যাসীয় পদার্থে রূপান্তরিত হয় । গ্যাসকে আবার শীতল করলে তা তরলে এবং আরাে শীতল করলে তরল পদার্থ থেকে কঠিন পদার্থে রূপান্তরিত হয় ।
যেমন- সাধারণতঃ একই পদার্থ তিনটি ভিন্ন অবস্থাতেই থাকতে পারে । যেমনঃ পানি, বরফ ও জলীয় বাষ্প একই পদার্থের তিনটি রূপমাত্র। সাধারণ তাপমাত্রার পানি একটি তরল পদার্থ । ইহাকে ০°C তাপমাত্রায় ঠান্ডা করলে তা কঠিনপানি বা বরফে রূপান্তরিত হয়। এ বরফকে তাপ দিলে তা আবার তরল পানিতে পরিণত হয়। তরল পানিকে 100°C তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করলে তা ফুটে গ্যাসীয় পদার্থ বা জলীয় বাষ্পে রূপান্তরিত হয় ।এই বাষ্পকে ঠান্ডা করলে তা আবার তরল পানিতে পরিনত হয় । এই, তরল পানিকে 0°C তাপমাত্রায় ঠান্ডা করলে তা আবারাে কঠিন পানি বা বরফে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ পানি, বরফ ও জলীয়বাষ্প একই পদার্থের তিনটি রূপ । সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে রেখা চিত্রের মাধ্যমে নিম্নরূপে দেখানাে যায়।

